একটি জীর্ণ কুঁড়েঘর থেকে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম আধ্যাত্মিক কেন্দ্রের অবিশ্বাস্য যাত্রা
From a humble hut purchased for 8 Taka to one of the world's greatest spiritual centres
বিশ্ব জাকের মঞ্জিল বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলার সদরপুর উপজেলার আটরশি গ্রামে অবস্থিত একটি বিখ্যাত ইসলামী আধ্যাত্মিক কেন্দ্র ও দরবার শরীফ। নকশবন্দীয়া মুজাদ্দেদীয়া তরিকার এই প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশের অন্যতম বৃহত্তম ধর্মীয় কমপ্লেক্স হিসেবে সারা বিশ্বে পরিচিত।
Bishwa Zaker Manzil is a renowned Islamic spiritual centre and Darbār Sharif located in Atroshi village, Sadarpur Upazila, Faridpur District, Bangladesh. Following the Naqshbandiyya Mujaddediyya Tariqa, this institution is recognised as one of Bangladesh's largest and most influential religious complexes.
বিশ্ব জাকের মঞ্জিল — আল্লাহ ও রাসূলে পাক (সাঃ)-এর মহা দান, বিশ্ব মানবের জন্য খোদাপ্রাপ্তির প্ল্যাটফর্ম, আধ্যাত্মিক শিক্ষাকেন্দ্র। দেশের সর্বত্র থেকে এখানে মানুষ আসে। আসে আত্মোপলব্ধির তাড়নায়, আসে নিজেকে চিনিবার জন্য, আসে খোদাতায়ালাকে চিনিতে, জানিতে বা বুঝিতে। আজ শুধু দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকেই নয় — পৃথিবীর সর্বত্র থেকেই লোক আসে।
Bishwa Zaker Manzil is a magnificent gift of Allah and His Messenger ﷺ — a platform for God-attainment for all humanity, a centre of spiritual education. People come from every corner of the country and from across the world — driven by a yearning for self-discovery and closeness to Allah.
হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী যেদিন প্রথম আটরশিতে পা রেখেছিলেন, সেদিন ছিল কোরবানীর ঈদের দিন। কিন্তু সেই ঈদের দিনের চিত্র ছিল ভিন্ন। লোকজন লাঙল লইয়া মাঠে যাইতেছে। নামাজ ছিল না, সমাজ ছিল না।
ধনী, মানী, জ্ঞানী, গুণী লোক ছিল না। গরু কোরবানী হইতো না। গরুর গোশতকে এই এলাকার মোসলমানেরা অস্পৃশ্য মনে করিত। ইসলাম কী — তাহারা জানিত না। পাশেই ছিল হিন্দু জমিদারের বাড়ী। এই এলাকার মোসলমানগণ জমিদার বাড়ীর পূজায় অংশ গ্রহণ করিত, পূজার প্রসাদ খাইত। তাহারা হিন্দুয়ানী রীতিতে ভালোবাসিত। ইসলামী আদর্শ ও মূল্যবোধ তাহাদের কাছে অপরিচিত ছিল।
On the very first day Hazrat Khwajababa Faridpuri arrived in Atroshi — it was the day of Eid al-Adha. But the scene was far from festive. People were heading to the fields with ploughs. There were no prayers, no Islamic community. The local Muslims did not sacrifice cattle; they considered beef impure. They participated in Hindu landlords' religious festivals and ate their offerings. Islamic ideals were entirely unknown to them.
হযরত কেবলাজান হুজুরের নির্দেশে বাংলা ১৩৫৪ সন হইতে এই আটরশি হইতে সত্য তরিকা প্রচার কাজ শুরু হয়। জনাব মহসিন খান ছাহেবের অতি ক্ষুদ্র একটি ছনের ঘর — যে ঘরে তিনি একটি বকনা বাছুর পালিতেন — সেই ঘর স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রদান করেন। সেই ক্ষুদ্র ঘর হইতেই তরিকা প্রচারের কর্মসূচী শুরু হয়।
Under the command of Pir Keblajan, from Bengali 1354 (1947 CE) the work of propagating the true Tariqa began from Atroshi. Mohsin Khan Saheb voluntarily offered a tiny thatched hut — where he had kept a calf — as the first centre of spiritual propagation.
প্রতি সপ্তাহে একটি করিয়া জলসা করিতেন। উপস্থিত খোদাতলাশীদের তালিম দিতেন, সবক দিতেন। আল্লাহ ও রাসূল পাক (সাঃ)-এর মহব্বতপূর্ণ ওয়াজ নসিহত শ্রবণে সকলেই অশ্রুপাত করিত। প্রতিটি জলসাতেই প্রচুর ফেয়েজ ওয়ারেদ হইত।
৮ রশি, সাড়ে ৭ রশি, ১৪ রশি, আড়াই রশি, ব্রাহ্মণবাড়ী প্রভৃতি এলাকার জাকেরান ও আশেকানগণ মুষ্টি চাউল দিত। তৎকালে গরুও খুব সস্তা ছিল। জাকেরানদের দেওয়া মুষ্টি দ্বারা সাপ্তাহিক জলসা সম্পন্ন করিতেন।
ধীরে ধীরে হেদায়েতের কলেবর বৃদ্ধি পায়। খোদাতালাশীদের ভিড় জমে। ফলে এক বছর অন্তে পার্শ্ববর্তী গ্রাম হইতে মাত্র আট (৮) টাকার বিনিমেয়ে একটি কুঁড়ঘর ক্রয় করেন। কুঁড়ঘরটির নাম দেওয়া হয় "জাকের ক্যাম্প।"
জাকের ক্যাম্পের ছাউনী ছিল ছনের এবং বেড়া বা বেষ্টনী ছিল সুপারী গাছের খোলের। আমার এক পুরাতন মুরিদ, নাম কালু লক্কর — সেই আমাকে সুপারী গাছের খোল সরবরাহ করিত।
প্রথমে নিকটস্থ এলাকা থেকে, তৎপর পার্শ্ববর্তী ইউনিয়ন, থানা, জেলা থেকে, এমনকি দেশের সর্বত্র থেকে দলে দলে মানুষ আসা শুরু করে। তাহাদেরকে তরিকা দিতাম, খোদাপ্রাপ্তির তালিম দিতাম।
ছনের ঘরের জায়গায় ক্রমে টিনের তৈরী ঘর এবং বেড়াও দেওয়া হয় টিন দ্বারা। তখন ক্যাম্পের নাম দেওয়া হয় "বিশ্ব জাকের মঞ্জিল।" এরই মধ্যে হেদায়েতের নূর পৌঁছায় দেশে-বিদেশে সর্বত্র।
বিশ্বওলী খাজাবাবা ফরিদপুরী বিশ্ব জাকের মঞ্জিল আলিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন — যেখানে ১ম শ্রেণি থেকে কামিল (স্নাতকোত্তর) পর্যন্ত পাঠদান করা হয়। মাদ্রাসার ছাত্রদের ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়।
১২ই রবিউল আউয়াল — পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবীর দিন — খাজাবাবা নিজেই বিশ্ব জাকের মঞ্জিলে জাকের পার্টির ফলক উন্মোচন করেন। দলটি গঠনের লক্ষ্য হলো জাগতিক ও আধ্যাত্মিক জ্ঞানের সমন্বয়ে আদর্শ ইসলামী সমাজ গঠন।
হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী 'বিশ্ব জাকের মঞ্জিলের পরিচালনা-পদ্ধতি' নামে ১৩৩ পৃষ্ঠার একটি গ্রন্থ স্বাক্ষর করেন। এতে তিনি তাঁর জীবনের বিস্তারিত বিবরণ, দরবারের পরিচালনার নির্দেশাবলী এবং আধ্যাত্মিক তালিমের পূর্ণ বিবরণ লিপিবদ্ধ করেন।
হযরত মাওলানা শাহসূফী খাজাবাবা হাশমতউল্লাহ ফরিদপুরী (কুঃ ছেঃ আঃ) ১৮ বৈশাখ ১৪০৮ বঙ্গাব্দ রাত ১টা ৩৫ মিনিটে ইন্তেকাল করেন। তাঁর পবিত্র রওজা শরীফ দরবার প্রাঙ্গণেই অবস্থিত — যেখানে প্রতিদিন হাজার হাজার ভক্ত জিয়ারতে আসেন।
তাঁর ইন্তেকালের পর তাঁর দুই পুত্র — পীরজাদা মাহফুযুল হক মুজাদ্দেদী ও পীরজাদা মোস্তফা আমীর ফয়সাল মুজাদ্দেদী — দরবার শরীফের পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
আজকের বহু হর্ম্যরাজিতে বা অট্টালিকায় সুসজ্জিত প্রাণমুখর এই বিশ্ব জাকের মঞ্জিল দেখিতে অনেকটা শহরের মতো। ইহার ক্ষেত্র যে কত বড় হইবে তাহা আল্লাহপাকই জানেন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল হইতে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ আসে — আসে বিদেশ থেকেও।
বিশ্ব জাকের মঞ্জিল জাতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান। এখানের সমস্তই মানব কল্যাণের জন্য। এই বহুমুখী প্রতিষ্ঠানে আছে আলীয়া মাদ্রাসা, সোনালী ব্যাংকের শাখা, পোস্ট অফিস, টেলিফোন এক্সচেঞ্জ, ৬০০ শয্যাবিশিষ্ট (প্রস্তাবিত) একটি হাসপাতাল (নির্মাণাধীন), সম্পূর্ণ পাথর নির্মিত দ্বিতল একটি মসজিদ (নির্মাণাধীন) এবং জাকেরানদের থাকিবার জন্য বহু অট্টালিকা।
Bishwa Zaker Manzil is a vital religious and social institution for the nation. Within this multifaceted complex: an Alia Madrasa, a Sonali Bank branch, Post Office, Telephone Exchange, a proposed 600-bed hospital (under construction), a double-storied all-stone Mosque (under construction), and numerous residential buildings for visiting Zakerāns.
বিশ্ব জাকের মঞ্জিল প্রতিদিন শত শত, হাজার হাজার তালেবে মাওলাগণ আসেন। তাহাদেরকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় — শরীয়ত, তরিকত, হকিকত ও মারেফাত তথা পূর্ণাঙ্গ ইসলাম সম্পর্কে। দিবা-নিশি ২৪ ঘণ্টা চলে এই প্রশিক্ষণ কর্ম।
Every day, hundreds and thousands of seekers of the Divine arrive at Bishwa Zaker Manzil. They receive training in Shariat, Tariqa, Haqiqat and Marefa — the full spectrum of Islamic knowledge. This training continues 24 hours a day, 7 days a week.
যাহারা জাগতিক সমস্যা লইয়া আসে, সেই সমস্যা সমাধানের উপদেশ দানের মাধ্যমেই তাহাদেরকে আধ্যাত্মিকতা শিক্ষা দেওয়া হয়; খোদাতায়ালার দিকে পথ দেখানো হয়। তাহাদের প্রত্যেকের জিহ্বাতেই এক ফোটা করিয়া আধ্যাত্মিক মধু প্রদান করা হয় — যে অমিয় মধুর মিষ্টি স্বাদ ও আকর্ষণে পুনঃপুনঃ তাহারা আসে।
নিশির শেষ যাম অর্থাৎ রাত ৩টা হইতে পরবর্তী দিনগত রাত ১১টা পর্যন্ত চলে শরীয়ত, তরিকত, হকিকত ও মারেফাতের তালিম। এই বিশাল মেহমানখানা পরিচালনা, দিবা-নিশি তালিম বা প্রশিক্ষণ দান; সুষ্ঠ ও সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা — ইহার সবই সম্ভব হয় কারণ এই দরবার আল্লাহ ও রাসূলের স্বীকৃত দরবার।
এই দরবার এমনই এক দরবার — যেখানে সুখের খানা খাওয়াইয়া, আরামের বিছানায় শোয়াইয়া খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বের তালিম দেওয়া হয়। শুধু খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্ব সম্পর্কেই নয়; তালিম (শিক্ষা) চলে পরিপূর্ণ সত্য ইসলামের উপরে, সত্য তরিকার উপরে; প্রশিক্ষণ চলে শরীয়ত, তরিকত, হকিকত ও মারেফাতের উপরে — দিন-রাত্রি ২৪ ঘণ্টা ব্যাপিয়াই।
বিশ্ব জাকের মঞ্জিলের এই দীর্ঘ প্রচার কার্য নিষ্কণ্টক ছিল না। ছিল শত বাধা, শত বিরোধ। ছিল সত্য তরিকার বিরুদ্ধে অপপ্রচার এবং এই তরিকা প্রচারক হিসেবে হযরতের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচার।
স্থূল দৃষ্টিসম্পন্ন আলেম-ওলামা ও তথাকথিত পীরেরা যুক্তফ্রন্ট করিয়া, সভা-সমিতি-সিম্পোজিয়াম করিয়া হযরতকে কাফের ফেতোয়া দিল। কত লিফলেট, বিজ্ঞাপন ছাড়িল। কিন্তু সত্য প্রচারে তিনি ছিলেন অবিচল।
The long years of propagation at Bishwa Zaker Manzil were not without obstacles. There were hundreds of barriers and oppositions. Narrow-minded scholars and so-called pirs joined forces, held conferences and symposiums, declared Hazrat a kafir, distributed leaflets and advertisements against him. But he remained unwavering in preaching the truth.
আজকের বহু হর্ম্যরাজিতে ও অট্টালিকায় সুসজ্জিত প্রাণমুখর বিশ্ব জাকের মঞ্জিল দেখিতে অনেকটা শহরের মতো। জাকের ক্যাম্পের সেই ৮ টাকায় কেনা কুঁড়েঘর আজ একটি বিশাল আধ্যাত্মিক মহানগরীতে পরিণত হয়েছে।
Today's Bishwa Zaker Manzil — adorned with numerous grand buildings — resembles a city. The humble 8-taka hut of Zaker Camp has transformed into a vast spiritual metropolis.
হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী নিজেই স্পষ্টভাবে বলেছেন যে এই বিশাল মেহমানখানার পরিচালনার দায়িত্ব আল্লাহ ও রাসূল (সাঃ)-এর। তিনি নিজেকে মনে করতেন তাঁহার পীর কেবলাজান হযরত খাজাবাবা এনায়েতপুরী (কুঃ)-এর পক্ষ হইতে মাত্র একজন তত্ত্বাবধায়ক।
আজকের এই শান-শওকতময় ও প্রাণমুখর বিশ্ব জাকের মঞ্জিল একদিনে গড়িয়া উঠে নাই। ইহার পিছনে আছে এই মিসকিনের দীর্ঘ ৪৫ বছরের প্রচার-জীবন। আছে বিরোধী ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা শক্তির মোকাবেলা। ইহা ব্যতীতও আছে আটরশিতে আসিবার পূর্বে পীরের কদমে প্রায় দীর্ঘ ৪০ বছরের অপরিসীম ত্যাগ-তিতিক্ষা, অনাহার-অনিদ্রা, সুকঠিন ব্রত, অতিশয় শ্রম, চরম দারিদ্র্য ও কঠোর রেয়াজতের পরীক্ষা উত্তরণ।
Today's glorious and vibrant Bishwa Zaker Manzil was not built in a single day. Behind it lies 45 years of this humble one's life of propagation — facing opposition from individuals, groups and forces. And before arriving at Atroshi, there were nearly 40 years of immeasurable sacrifice at the Pir's feet — fasting, sleeplessness, extreme hardship, labour, poverty and rigorous spiritual trials.
বিশ্ব জাকের মঞ্জিল বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলার সদরপুর উপজেলার আটরশি গ্রামে অবস্থিত। ফরিদপুর জেলা সদর থেকে এর দূরত্ব প্রায় ১৫-২০ কিলোমিটার। বার্ষিক ওরস শরীফ উপলক্ষে ২০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করা হয়।
Bishwa Zaker Manzil is situated in Atroshi village, Sadarpur Upazila, Faridpur District, Bangladesh. It is approximately 15–20 kilometres from Faridpur district headquarters. During the annual Urs Sharif, events extend across a 20-kilometre radius.